ইন্টারনেট কী? এটা কীভাবে কাজ করে? ইতিহাস সহ বিস্তারিত

ইন্টারনেট কী? এটা কীভাবে কাজ করে? ইতিহাস সহ বিস্তারিত

ইন্টারনেট ছাড়া এখন যেন পুরো দুনিয়াটাই অচল। বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করা, পছন্দের গান বা মুভি ডাউনলোড দেওয়া, ঘরে বসেই কেনাকাটা করা, সারা বিশ্বের প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর নেওয়া ইত্যাদি আরো হাজারো কাজে ইন্টারনেট আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ফোন বা কম্পিউটারে যখন ইন্টারনেট কানেকশন না থাকে, তখন যেন আর কোনোকিছুই ভাল লাগে না।

তো, এই ইন্টারনেট আসলে কী জিনিস? এটা কাজ ই বা করে কীভাবে? এখন আমরা এগুলো সম্পর্কেই বিস্তারিত জানব।

ইন্টারনেট কী?

ইন্টারনেট সম্পর্কে জানার আগে নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

নেটওয়ার্ক হল, পরস্পরের সাথে সংযুক্ত কয়েকটা কম্পিউটার যারা নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করতে পারে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ক কে একটা ফ্রেন্ড সার্কেল এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে, যেখানে সবাই একে অন্যকে চেনে, নিয়মিত যোগাযোগ রাখে এবং একসাথে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করে।

Computer Network

আর ইন্টারনেট হল, সারা বিশ্বের এরকম অসংখ্য কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সমষ্টি, যেগুলো পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থাকে। মূলত Internet শব্দটার উৎপত্তি ও Interconnected Network থেকে হয়েছে।
অন্যভাবে বললে, ইন্টারনেট হল পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত কম্পিউটারগুলোকে একত্রে যুক্ত করার একটা মাধ্যম। এটা একটা নেটওয়ার্ক যেটা সারা বিশ্বে একটা অদৃশ্য জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে আর এই জালের সাথে যুক্ত সব কম্পিউটারগুলোকে একে অন্যের সাথে যুক্ত করে রেখেছে। যাতে সেগুলো পরস্পরের মধ্যে সহজেই বিভিন্ন ধরনের তথ্য আদান প্রদান করতে পারে।

ইন্টারনেট এর মাধ্যমে আপনি প্রায় যেকোনো বিষয়ের তথ্য জানতে পারবেন (যেমন, এখন ইন্টারনেট সম্পর্কে জানছেন)। পৃথিবীর যে প্রান্তেই আপনি থাকেন না কেন, অন্য যেকোনো প্রান্তে থাকা কারোর সাথে খুব সহজেই এবং খুব দ্রুত যোগাযোগ করতে পারবেন।
ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত একটা মোবাইল ফোন হাতে থাকা মানে যেন, পুরো পৃথিবীটাই হাতের মুঠোয় থাকা।

ইন্টারনেট কীভাবে কাজ করে?

ইন্টারনেট কী, সেটাতো জানলাম। কিন্তু এটা কাজ করে কীভাবে?

অনেকেই হয়ত মনে করতে পারেন যে, ইন্টারনেট কাজ করে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। কিন্তু না, ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কাজ করেনা। ইন্টারনেটের মূল ভিত্তি হল, বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ফাইবার অপটিক ক্যাবল। যেগুলো সমুদ্র, পাহাড় ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে। স্যাটেলাইট এর পরিবর্তে ফাইবার অপটিক ক্যাবল ব্যবহারের কারণ হল, স্যাটেলাইটের অবস্থান পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২২,০০০ মাইল উপরে, ফলে ডেটা আদান-প্রদানের জন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় দুরত্ব অতিক্রম করা লাগে এবং ডেটা আদান-প্রদানের গতি অনেক কমে যায়।

Submarine Cable Map

এখন আপনি বলতে পারেন যে, “কই? আমার স্মার্টফোনের সাথে তো কোনো ক্যাবল লাগানো ছাড়াই ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়”।

মূলত, আমরা যারা মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করি তাদের স্মার্টফোনগুলো মোবাইল সেল টাওয়ারের সাথে তারবিহীনভাবে যুক্ত থাকে। কিন্তু, সেল টাওয়ারগুলো ঠিকই ক্যাবল এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যাকবোন এর সাথে যুক্ত থাকে। আবার, যদি আমরা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহার করি তাহলে আমাদের ফোন বা ল্যাপটপ আমাদের রাউটারের সাথে যুক্ত থাকে তারবিহীনভাবে। কিন্তু, রাউটারটি ক্যাবলের মাধ্যমেই ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকে। এভাবে সারা বিশ্বের কম্পিউটারগুলো একে অন্যের সাথে যুক্ত থাকে বিভিন্ন উপায়ে।

কম্পিউটারের ডেটাগুলো ইলেকট্রিক অথবা লাইট পালস হিসাবে আদান প্রদান হয়, যেগুলোকে Bits বলা হয়। রেডিও তরঙ্গ অথবা ক্যাবলগুলো এই Bits গুলোকে আলোর বেগে পরিবহন করে। একসাথে যত বেশি Bits পরিবহন হবে, ইন্টারনেটের গতিও তত বেশি হবে।

ইন্টারনেটের ইতিহাস

ইন্টারনেট কী, কীভাবে কাজ করে সেসব তো জানলাম। এবার একটু এর ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

১৯৬৯ সালের ২৯ এ অক্টোবর মার্কিন সামরিক বাহিনীর গবেষণা সংস্থা অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি বা আরপা (ARPA) পরীক্ষামূলকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। প্যাকেট সুইচিং পদ্ধতিতে তৈরি করা এই নেটওয়ার্ক আরপানেট (ARPANET) নামে পরিচিত ছিল। এটা চালু হওয়ার পর একটি সংস্থা অন্য একটি সংস্থার সাথে তথ্য এবং ফাইলস আদান-প্রদান করতে পারত। পরবর্তিতে ARPANET নামটিকে পরিবর্তন করে Internet নাম দেওয়া হয়।

প্রথম দিকে শুধুমাত্র কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী এবং ইঞ্জিনিয়াররাই এই যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করত। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা সাধারণ মানুষেরাও ব্যবহার করতে শুরু করে।

১৯৭০ দশক ছিল আধুনিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ১৯৭২ সালে ইমেইল (Email) সেবা চালু হয়। সারা বিশ্বের সমস্ত লাইব্রেরীগুলো একত্রে যুক্ত হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এ সময় ট্রান্সপোর্ট কন্ট্রোল প্রোটোকল এবং ইন্টারনেট প্রটোকল (TCT/IP) তৈরি হয় যেটা তথ্য আদান-প্রদান কে অনেক সহজ করে ফেলে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোনো তথ্য কিভাবে আদান-প্রদান হবে সেটার একটা স্ট্যান্ডার্ড পদ্ধতি এই প্রোটোকলগুলোর মাধ্যমে তৈরি হয়।

পরবর্তিতে, ১৯৮৬ সালে দ্য ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশন সারাদেশে বিস্তৃত সুপারকম্পিউটারের একটা নেটওয়ার্কের (NSFNET) মাধ্যমে ইন্টারনেটের বিকাশকে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ে যায়। এই সুপারকম্পিউটারগুলো মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজের জন্য কম্পিউটারের ব্যবহারকে সহজলভ্য করে।

১৯৯১ সালে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় সর্বপ্রথম ব্যবহার উপযোগী ইন্টারনেট ইন্টারফেস তৈরি করে, যেটা বিশ্ববিদ্যালয়টির তথ্য ও ফাইলস আদান-প্রদান অনেক সহজ করে দেয়। পরবর্তিতে নেভাডা বিশ্ববিদ্যালয় এই ইন্টারফেসটির আরো উন্নয়ন করতে থাকে।

যেহেতু, ইন্টারনেট খুব দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ও পরিবর্তন হচ্ছিল, তাই ১৯৯৫ সালের মে মাসে ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশন NSFNET এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। যার ফলে, ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর হতে থাকে এবং এটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

Leave a Reply